করোনা মোকাবিলায় গত দুই মাসে আমরা কী করেছি

অনলাইন ডেস্ক | ২১ মার্চ ২০২০ | ২:১৬ অপরাহ্ণ

বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা এখনো করোনাভাইরাসের সংক্রমণের উৎসের কূলকিনারা করতে পারছেন না। তাঁরা গত দেড় মাসের গবেষণার ভিত্তিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আপাতত কিছু ব্যবস্থার পরামর্শ দিয়েছেন। তার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের অফিসে না যাওয়ার উৎসাহ দিয়েছে। বাসায় বসে কাজের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে অনেককেই। অনেক ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টিন পরিস্থিতি।

কোয়ারেন্টিন শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় ১ ফেব্রুয়ারি থেকে। ওই দিন চীনের উহান শহর থেকে ৩১২ জন বাংলাদেশিকে বিশেষ ব্যবস্থায় বিমানে করে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে তাঁদের আশকোনায় হজ ক্যাম্পে নেওয়া হয়। ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। বিমান এসেছিল দুপুরের পর। আমি আশকোনায় গিয়েছিলাম সকাল আটটার আগেই। নজরে পড়ে, সরকার প্রস্তুত নয়। ওই দিন রাতেই কোয়ারেন্টিনের বাসিন্দারা প্রথম আলোর কাছে মুঠোফোনে নানা অভিযোগ করেছিলেন। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তা সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানানো হয়।

প্রথম কোয়ারেন্টিন কার্যক্রমের দুর্বলতা থেকে শিক্ষা নেয়নি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশবাসী এটা প্রত্যক্ষ করে ১৪ মার্চ বা তার পরবর্তী দিনগুলোতে। ইতালিফেরত ১৪২ জন বাংলাদেশিকে আশকোনায় হজ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টিন করতে পারেনি সরকার। প্রবাসীরা সরকারি ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায় অসন্তোষ ও বিক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই দুটি ঘটনায় বা করোনা–সম্পর্কিত অন্যান্য ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে বলিষ্ঠ কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, যাচ্ছে না। মিনমিন স্বরে কিছু কথা বলছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ ওই মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা। দেশবাসী তাঁদের বক্তব্যে আস্থা রাখতে পারছে না।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও শুরু থেকে করোনা পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে চলেছে। গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্থানীয় কার্যালয় জানায়, দেশটির হুবেই প্রদেশের উহান শহরে অজ্ঞাত ধরনের নিউমোনিয়ায় মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধান ও গবেষণা শুরু হয়। সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, একটি নতুন ধরনের ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এর আগে মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছে, ইতিহাসে তার নজির নেই। ভাইরাসটি মার্স বা সার্সের মতো করোনা পরিবারের। সম্পূর্ণ নতুন বলে একে ‘নভেল করোনাভাইরাস’ বলা হয়। আরও পরে আনুষ্ঠানিক নাম হয় ‘কোভিড–১৯’।

ভাইরাসটির জিন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, কোনো একটি প্রাণী থেকে এর উৎপত্তি। কোন প্রাণী, তা এখনো শনাক্ত হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, ওই প্রাণী থেকে ভাইরাসটি সরাসরি মানুষের শরীরে আসেনি। মধ্যবর্তী অন্য কোনো বাহক ছিল। বাদুড় যেসব ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটনায়, তার সঙ্গে এই ভাইরাসের প্রায় ৮০ শতাংশ মিল আছে। তাই বিজ্ঞানীদের একটি অংশের ধারণা, অজ্ঞাত প্রাণী থেকে বাদুড় এবং বাদুড় থেকে মানুষে এর সংক্রমণ ঘটেছে। প্রাণী থেকে নতুন নতুন রোগ মানুষে ছড়ানোর ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এ বিষয়ে ‘একের পর এক নতুন রোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ৮ ফেব্রুয়ারি ছাপা হয়।

শুরু থেকেই প্রথম আলো করোনাভাইরাসকে গুরুত্ব দিয়েছে। সম্পাদক ও সংবাদ ব্যবস্থাপকেরা অকৃপণভাবে জায়গা বরাদ্দ দিয়েছেন। আমাদের দায়িত্ব বেড়েছে। প্রতিদিনের রিপোর্ট করার পাশাপাশি এই ভাইরাসের বিজ্ঞান, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনস্বাস্থ্য সমস্যা, ব্যবসা–বাণিজ্যে প্রভাব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা, বিশ্বের কোন দেশ কী করছে, বিবিসি বা সিএনএন কী প্রকাশ করছে, তা নিয়মিত দেখছি। বিশেষ সহায়তা পেয়েছি যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সিস্টেমস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওয়েবসাইট ও সিডিসির ওয়েবসাইট থেকে। চীনের ঘটনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চীনের ৪০ পৃষ্ঠার যৌথ মিশন প্রতিবেদন। সব সময় বুঝে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছি, পরিস্থিতির ভয়াবহতার তুলনায় আমরা কী করছি। আমরা বলতে শুধু সরকার নয়, সমগ্র সরকার, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী ইত্যাদি। অবশ্য প্রতিদিনের প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থেকেছি সরকারি কর্মকাণ্ডের বিষয়ে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে।

‘দেখি কী হয়, দেখি কী হয়’—এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কালক্ষেপণ করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা। প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ৮ মার্চ আমাকে বলেছিলেন, ‘রোগী শনাক্ত হবে জানতাম; কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হবে, সেটা ভাবিনি।’

জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে করোনাভাইরাস–বিষয়ক প্রতিবেদন প্রথম আলোতে ছাপা হতে থাকে। কী হচ্ছে উহানে, চীনের বিভিন্ন প্রদেশে কীভাবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, কত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে—এসব খবরই ছাপা হতে থাকে আন্তর্জাতিক পাতায়। চীন থেকে যখন প্রবাসীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ শুরু হয়, তখন থেকেই করোনা প্রথম আলোর প্রথম পাতায় জায়গা করে নেয়। প্রথম আলো সমস্যার ব্যাপকতা ও গভীরতা উপলব্ধি করে, এর ফলাফল ও পরিণতি কী হতে পারে, তা অনুমান করে করোনাকে বড় ইস্যু হিসেবে বেছে নেয়। আমি এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের ‘পরিস্থিতি প্রতিবেদন’ প্রথম প্রকাশ করে ২১ জানুয়ারি। তখন হুবেইসহ চীনের চারটি প্রদেশ এবং জাপান, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৮২ জন। মাত্র সাত দিন পর ভাইরাসটি ২৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ৩১ জানুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে। এর পরদিন ৩১২ জন প্রবাসী চীন থেকে দেশে ফেরেন।

সরকারি কর্মকর্তারা প্রথম থেকে বলে এসেছেন, দেশে ঝুঁকি আছে, প্রস্তুতিও আছে। দিন যত গড়ায়, ঝুঁকির পারদ তত ওপরে উঠতে থাকে, কিন্তু প্রস্তুতির বিষয়টি অনেকটাই মুখের বুলি হয়ে থাকে। দৃশ্যমান কাজের মধ্যে দেশের মানুষ দেখতে পায় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনার নিপুণ সংবাদ ব্রিফিং। দু–এক দিনের ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিদিন ঠিক ১২টায় সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং করে চলেছেন তিনি। এই একটি ঘটনাই এই সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের, তথা সরকারের ভাবমূর্তি অনেক উজ্জ্বল করেছে। মীরজাদী সেব্রিনা দেখিয়েছেন, শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময়ানুবর্তী হওয়া যায়। সময় মেনেই মাঠেঘোরা সাংবাদিকদের মন জয় করা যায়।

মীরজাদী সেব্রিনার কারণে মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হয় আইইডিসিআর সম্পর্কে। প্রথম আলোর সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্র ছুটির দিনের জন্য লেখার চাপ আসে। মীরজাদী সেব্রিনা সময় দিয়েছিলেন ১৫ মিনিট। আলোচনা গড়ায় প্রায় দেড় ঘণ্টায়। আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই তাঁর কার্যালয়ে চলে আসেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত, তাঁকে বসিয়ে রেখে আলোচনা অব্যাহত রাখেন তিনি। একসময় রাষ্ট্রদূত তাঁর সহকর্মী নিয়ে কক্ষের বাইরে যান। প্রথম আলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে মীরজাদী সেব্রিনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ছবি তোলেন।

সরকারের মুখপাত্র হয়ে মীরজাদী সেব্রিনা যেভাবে পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেছেন, করোনার বাস্তব পরিস্থিতি ততটা মসৃণ নয়। দেশে দেশে রোগের প্রকোপ, মহামারি এসব মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। সংস্থাটি কী কী কাজ করতে হবে, তার নির্দেশনা দিয়ে চলেছে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে। দেশে একটিও রোগী শনাক্ত হয়নি; দেশে দু–একটি রোগী শনাক্ত হয়েছে, তবে তারা বিদেশ থেকে এসেছে; দেশে কমিউনিটিতে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে এবং দেশে সংক্রমণ ব্যাপাকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে—এই চারটি স্তরে দেশগুলোকে ভাগ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কোন স্তরে থাকার সময় কী কী কাজ করতে হবে, স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। মীরজাদী সেব্রিনা সব সময় বলেছেন, সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনেই কাজ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলেছে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে। আইইডিসিআরের পাশেই আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়। আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগায় অনেক দেশ। ১৮ মার্চের আগপর্যন্ত আইসিডিডিআরবিকে করোনা শনাক্ত করার অনুমতিই দেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এমন কানাঘুষা আছে যে ব্যক্তিগত পছন্দ–অপছন্দের কারণে আইসিডিডিআরবিকে এই সময় দূরে রেখেছেন জনাদুয়েক প্রভাবশালী কর্মকর্তা।

বিশ্বের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের আগ্রহের শেষ নেই করোনা নিয়ে। প্রভাবশালী জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়কী ল্যানসেট ছয়টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে ফেব্রুয়ারির শুরুতে। ১ জানুয়ারি থেকে চীনের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের নিয়ে করা গবেষণা প্রবন্ধ আকারে প্রকাশ করে ল্যানসেট। বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে এই রোগের লক্ষণ কী, কোন বয়সী ব্যক্তিরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ইত্যাদি। গবেষণা প্রবন্ধগুলোর তথ্য নিয়ে প্রথম আলো ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এ দেশে করোনাভাইরাস নেই, এলে আসবে বিদেশ থেকে আসা মানুষের মাধ্যমে। চীন, সিঙ্গাপুর, ইতালি, ভারত বা অন্য কোনো দেশ থেকে। তাই বারবার আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোর (বিমান, স্থল ও সমুদ্র) প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে এসেছে। অপ্রস্তুতির বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এসব রিপোর্ট লেখার সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির (২০০৫) বিষয়টি নজরে আসে। বাংলাদেশ এই বিধি মেনে চলার অঙ্গীকার করেছে। অনুসন্ধান করে দেখতে পাই, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ কর্মপরিকল্পনা আছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। এর জন্য অর্থ বরাদ্দ ছিল। এ নিয়ে প্রথম আলো অনিয়মের প্রতিবেদন প্রকাশ করে ৩ মার্চ।

অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মতো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও সংবাদপত্রের ক্লিপিং রাখে। ৩ মার্চ যেসব ক্লিপিং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছিল, তাতে প্রথম আলোতে প্রকাশিত দুর্নীতির ওই রিপোর্ট ছিল না। ওই দিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে করোনাবিষয়ক জাতীয় কমিটির মিটিং শেষে প্রেস ব্রিফিং করেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সভাকক্ষ ছিল সাংবাদিকে ঠাসা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘১৭ মার্চ নিয়ে আপনারা কী ভাবছেন?’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যসচিব বিদেশি অতিথিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কীভাবে করবেন, তার বর্ণনা দিয়েছিলেন। জুতসই উত্তর না পেয়ে আবার প্রশ্ন করেছিলাম, ‘আপনারা ১৭ মার্চের অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত বা কাটছাঁট করবেন কি না?’ সন্তোষজনক উত্তর পাইনি। শুধু মনে হয়েছিল, বিশ্বে কী ঘটে যাচ্ছে সে ব্যাপারে তাঁরা অবগত নন।

শুরু থেকেই দেখার চেষ্টা করেছি, বিশ্বে কী ঘটছে, বাংলাদেশে কী হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের জাতীয় পরিকল্পনা প্রকাশের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে। এ দেশেও সরকার একটি পরিকল্পনা করেছে। সেটা বাস্তবায়নের জন্য ১১টি কমিটি গঠন করার কথা ছিল। ৪টির বেশি কমিটি গঠিত হয়নি। এখন জানতে পেরেছি, কমিটি গঠন করতে না পারায় জাতীয় পরিকল্পনা দলিল থেকে কয়েকটি কমিটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকায় মীরজাদী সেব্রিনা আর জেনেভায় তেদরোস আধানোমের ব্রিফিং নিয়মিত অনুসরণ করি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের নির্দেশনা বাংলাদেশ কতটুকু মানছে, তা পরের দিনের প্রেস ব্রিফিংয়ে মীরজাদী সেব্রিনাকে জিজ্ঞেস করি। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ঘটনা ও তথ্য সরকারি কর্মকর্তাদের কানে তোলার চেষ্টা করেছি। দেখেছি কানে তুলো দেওয়া।

৮ মার্চ ব্রিফিং ছিল বিকেলে। আমি ব্রিফিংয়ে থাকতে পারিনি। ওই দিন তিনজন আক্রান্তের ঘোষণা আসে। দ্রুত সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। আতঙ্ক যেন না ছড়ায়, সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা বারবার বলা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সাংবাদিকদের করণীয় বিষয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা ও পরিকল্পনা বিভাগে ‘ঝুঁকি যোগাযোগ’ বিষয়ে আরও একটি কর্মশালা হয়। কর্মশালায় বলেছিলাম, অলিম্পিকের মতো ইভেন্ট কাভার করার সৌভাগ্য সব সাংবাদিকের হয় না, কিন্তু উপস্থিত সাংবাদিকদের সৌভাগ্য এই যে তাঁরা অলিম্পিকের চেয়ে বড় ইভেন্ট কাভার করছেন। এ জন্য তাঁদের গর্ব হওয়া উচিত। দক্ষতার সঙ্গে শুধু দায়িত্ব পালন করলেই হবে না, সঙ্গে থাকতে হবে কর্তব্যবোধ। এই দুর্যোগের সময় কর্তব্যবোধ না থাকলে সঠিক সাংবাদিকতা হবে না।

এ কথা সত্যি যে করোনা শনাক্তকরণ কিট শুরুতে ছিল না। কিট তৈরির পর বাংলাদেশ সামান্যই পেয়েছিল। বাংলাদেশে পরীক্ষা সীমিত রাখার সেটি একটি কারণ হতে পারে, কিন্তু কিটের ব্যাপারে সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে, তা পরিষ্কার করে কখনো বলেননি সরকারি মুখপাত্র। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তাও নিতে চাননি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেছি। তথ্যের অবাধ প্রবাহ না থাকলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনুমাননির্ভর হতে হয়। এ ক্ষেত্রে গত বছরের ডেঙ্গুর অভিজ্ঞতা পাঠকের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাই। সরকারি হিসাবে আইইডিসিআরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর তথ্য এসেছিল ২৭৬টি। ডেঙ্গুবিষয়ক পর্যালোচনা কমিটি বলেছিল, নিশ্চিত ডেঙ্গুতে মৃত্যু ১৭৯টি। বাকি ৯৭টি মৃত্যু কোন রোগে হয়েছিল, তা আজও বলেনি আইইডিসিআর। ডেঙ্গুর অভিজ্ঞতা আইইডিসিআর করোনার ক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে চায়। করোনার সব লক্ষণ–উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে এবং মারা গেলে কেউ বলতে পারবে না সে করোনাভাইরাসের কারণেই মারা গেছে। কারণ, পরীক্ষা করা হবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনার সংক্রমণ ও করোনায় মৃত্যু কম দেখানোর পথে হাঁটছে। তারা দেখাতে চায়, দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো অনেক ভালো। একবারও তাদের মাথায় আসে না যে ডেঙ্গু বা করোনার সংক্রমণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দায়ী নয়।

ঠিক তথ্য প্রকাশ না করায় জনমনে সন্দেহ দেখা দেয়। নিপুণভাবে সংবাদ ব্রিফিং করেও মানুষকে আস্থার জায়গায় নিতে পারেননি মীরজাদী সেব্রিনা। কেন একাধিক কেন্দ্রে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা হচ্ছে না, সংখ্যা কেন বাড়ানো হচ্ছে না—এর সন্তোষজনক উত্তর সাংবাদিকেরা পাননি। সংবাদমাধ্যমে দেশবাসীও জানতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে আস্থার বিষয়টি সামনে চলে আসে। সরকারের ওপর আস্থা হারালে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। রোগী হাসপাতাল ছেড়ে পালায়, স্বাস্থ্যকর্মী কর্মস্থলে নিরাপদ বোধ করেন না। ইতিমধ্যে রাজধানীসহ একাধিক জেলায় এমন একাধিক ঘটনা ঘটে গেছে।

বিজ্ঞানীরা নতুন এই ভাইরাসের চরিত্র এখনো বুঝে উঠতে পারেননি। মহামারি কোন পর্যায়ে যাবে, অনুমান করতেও দ্বিধা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। মানুষ তাকিয়ে আছে ওষুধবিজ্ঞানীদের দিকে। একটি ভাইরাস বিশ্বের দেশগুলোকে ‘আইসোলেশনে’ নিয়ে গেছে। অতি ক্ষুদ্র একটি প্রাণ ভয় আর উৎকণ্ঠার জালে ফেলেছে বিশ্বের প্রায় সাড়ে সাত শ কোটি মানুষকে। আশার আলো দেখাচ্ছে চীন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া। দুর্যোগময় এই সময়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

শিশির মোড়ল: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি
[email protected]

মতামত
২১ মার্চ ২০২০